কংক্রিটে মরণফাঁদ কুয়াকাটা সৈকত, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।

আবুল হোসেন রাজু
কুয়াকাটা(পটুয়াখালী)থেকে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এখন নীরব এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সমুদ্রভাঙনে বিলীন হওয়া বিভিন্ন স্থাপনার ভাঙা কংক্রিট, লোহার অংশ এবং অবকাঠামোর ধ্বংসাবশেষ সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। জোয়ারের সময় এসব ধ্বংসাবশেষ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা। এলাকাবাসীর দাবি, ইতোমধ্যেই এসবের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত সিকদার রিসোর্টের ‘বিচ ক্লাব’ নামের একটি স্থাপনা ২০২২ সালে জেলা প্রশাসনের অভিযানে উচ্ছেদ করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ওই স্থাপনার ভাঙা কংক্রিট ও ধ্বংসাবশেষ এখনো অপসারণ করা হয়নি।
এছাড়া ২০০৫ সালে জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্বে ঝাউবন এলাকায় ১ হাজার ৬১৩ হেক্টর জমির ওপর নির্মিত হয় কুয়াকাটা ইকোপার্ক। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের উপকূলীয় ভাঙনে উদ্যানের একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীন হওয়া বিভিন্ন স্থাপনার টয়লেট, রান্নাঘর, টিউবওয়েল, গোলঘর, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও ফটকের কংক্রিট অংশ এখনো সৈকত ও সমুদ্রের ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে। অনেক জায়গায় এসব বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকলেও কিছু অংশ উপরে উঠে থাকায় তা সহজে চোখে পড়ে না, ফলে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
স্থানীয় জেলে রাসেল মিয়া বলেন,জোয়ারের সময় ভাঙা কংক্রিটগুলো দেখা যায় না। জাল টানতে গিয়ে আমরা আঘাত পাই। প্রায়ই হাত-পা কেটে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনির হোসেন বলেন, জোয়ারের সময় পুরো সৈকত পানির নিচে চলে যায়। তখন কোথায় কী আছে বোঝা যায় না। দুই বছর আগে মো. ইউনুস নামে এক মোটরসাইকেল চালক ভোরে পর্যটক আনতে গিয়ে কংক্রিটে ধাক্কা খেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। আমরা দ্রুত এসব অপসারণের দাবি জানাই।
কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটক রায়হান বলেন, আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গোসলে নেমেছিলাম। পানির নিচে থাকা কংক্রিটে একজনের মাথায় আঘাত লাগে। পুরো ভ্রমণের আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়। এমন ঝুঁকি থাকলে মানুষ এখানে আসতে ভয় পাবে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান মিরাজ বলেন, সমুদ্রভাঙনে বিলীন হওয়া স্থাপনাগুলোর কংক্রিট ধীরে ধীরে বালুর নিচে চাপা পড়লেও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সময়ের সঙ্গে এগুলো আরও বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হতে পারে। এটি শুধু জননিরাপত্তার জন্য নয়, উপকূলীয় পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়নের সহকারী পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন,পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ জানান,সৈকতে পড়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ কংক্রিট অপসারণের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পর্যটননির্ভর কুয়াকাটার নিরাপত্তা ও সুনাম রক্ষায় দ্রুত এসব ধ্বংসাবশেষ অপসারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও সচেতন মহল।


আপনার মন্তব্য লিখুন