হাসপাতালের বারান্দায় চার সন্তানকে নিয়ে বসে আছেন এক বাবা। চোখেমুখে ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ। পাশে নেই সন্তানের মা, গেছেন তাদের পরিহিত ময়লা কাপড় পরিষ্কার করতে। এমন দৃশ্য এখন পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে।

জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকেই বাধ্য হয়ে বারান্দায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা বলছেন, রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

দশমিনা উপজেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় চার সন্তানকে নিয়ে জেলা হাসপাতালে এসেছেন আবেদ আলী। কিন্তু শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দাতেই ঠাঁই হয়েছে তার পরিবারের। চিকিৎসকের অপেক্ষায় রয়েছে তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।

আবেদ আলীর ছোট ছেলে মামুনের বয়স দুই বছর পূর্ণ হতে আর একদিন বাকি। জন্মদিনের আনন্দের বদলে এখন সে অসুস্থতায় কাতর। সারা শরীরে অস্থিরতা, মাঝেমধ্যে গুনগুন করে কান্না। গত তিন দিন ধরে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি পুরো পরিবার।

একই চিত্র দেখা গেছে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডেও। সেখানে ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন আমতলী উপজেলার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক (৩৩)। হামের উপসর্গ ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে গতকাল সকালে ভর্তি হলেও ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো চিকিৎসকের দেখা পাননি বলে অভিযোগ তার।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৩০টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১৩২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসাসেবায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা এক নার্স বলেন, রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আমাদের ওপর চাপ অনেক বেশি। প্রয়োজনীয় সেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, কিন্তু শয্যা ও জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমীন জানান, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ৯ শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন। ফলে এক বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ, তাই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবুও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, বলেন তিনি।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় দ্রুত আরও দুটি ওয়ার্ডকে হাম আইসোলেশন ইউনিট হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে প্রায় ২ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৩ জন হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

মো. আল আমিন, স্টাফ রিপোর্টার, আমাদের পটুয়াখালী।