‎পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও পাইকার সংকটে মাঠেই পড়ে আছে হাজার হাজার তরমুজ, লোকসানে দিশেহারা কৃষক
‎জাকারিয় আশ্রাফী স্টাফ রিপোর্টার
‎পটুয়াখালীর সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের চারা বুনিয়া গ্রামে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। আজ বুধবার (০১ এপ্রিল ২০২৬) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠজুড়ে পাকা তরমুজ থাকলেও ক্রেতা না থাকায় হতাশায় দিন কাটছে তাদের।
‎সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে লাল-সবুজ তরমুজের সমারোহ। কিন্তু সেই তরমুজ তুলতে আগ্রহ নেই পাইকারদের। ফলে ক্ষেতেই পড়ে আছে হাজার হাজার তরমুজ। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
‎স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা আর আগের মতো তরমুজ কিনতে আসছেন না। ফলে বাজারে তৈরি হয়েছে স্থবিরতা।
‎তরমুজ চাষি মোঃ জাহাঙ্গীর মাতুব্বর বলেন,
‎“আমার বাড়ি বরগুনার আমতলীতে। দীর্ঘদিন ধরে পটুয়াখালীতে এসে তরমুজ চাষ করি। এবার ১২০ কাঠা জমিতে চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নেই। পরিবারের স্বর্ণ বন্ধক রেখে এবং ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। এখন প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি।”
‎তিনি কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সরকারের কাছে প্রণোদনা সহায়তার দাবি জানান।
‎আরেক কৃষক শামসুল হক তালুকদার বলেন,
‎“তরমুজ চাষের জন্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছি। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। এখন ঋণ শোধ করতে সম্পত্তি বিক্রি করতে হতে পারে। আমরা চরম সংকটে আছি।”
‎কৃষকদের অভিযোগ, সার, বীজ, শ্রমিক ও সেচ খরচ সবকিছুর দাম বেড়েছে। অতিরিক্ত খরচ করে ভালো ফলন পেলেও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে তারা লাভ তো দূরের কথা, মূলধনও তুলতে পারছেন না।
‎স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় প্রতি বছরই মৌসুমে কৃষকরা এমন সংকটে পড়েন। পর্যাপ্ত হিমাগার না থাকায় দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যগুলো বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয় বা ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যায়।
‎এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান,
‎“আমরা কৃষকদের পাশে আছি। বাজারজাতকরণ সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
‎অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ, পরিবহন খরচে ভর্তুকি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একই সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কৃষকরা এমন লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
‎এদিকে চারা বুনিয়া গ্রামের তরমুজ চাষিরা এখন একটাই দাবি জানাচ্ছেন—
‎সরকার যেন দ্রুত প্রণোদনা, সহজ ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখে।
‎নইলে, এমন লোকসানের পর আগামী মৌসুমে তরমুজ চাষে আগ্রহ হারাবেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।