মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে থমকে গেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য আহরণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম। ডিজেলের অভাবে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছে না অন্তত ছয় হাজার ট্রলার। এতে জেলে পরিবারগুলো তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় এই সংকট সবচেয়ে বেশি। কয়েকদিন ধরে নদীর ভাসমান সব পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। ফলে পাম্পগুলোর কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন মালিকরা। জ্বালানির অপেক্ষায় ঘাটে ঘাটে নোঙর করে আছে অসংখ্য মাছ ধরার ট্রলার। পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, কক্সবাজার উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারের জন্য ২১টি পেট্রোল পাম্পে প্রতি মাসে অন্তত ১০ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।
বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট উপকূলে দেখা যায়, তেল না থাকায় পলিথিন মুড়িয়ে পাম্প বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তারপরও জ্বালানির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন খুরুশকুল এলাকার তছলিম মাঝির মালিকানাধীন ‘এফবি মায়ের দোয়া’ ট্রলারের জেলে দিদারুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা তো গরিব মানুষ। পেটের দায়ে জীবনঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যাই। তেল না পেলে আমরা সাগরে যাব কীভাবে? আর সাগরে যেতে না পারলে সংসার চালাবো কীভাবে?’ তিনি বলেন, ‘শুধু আমি একা নই, আমার ওপর নির্ভর করছে বাড়ির অনেক মানুষ। আমরা যদি মাছ ধরতে না পারি, আয় না হয়, তাহলে পরিবারকে কীভাবে খাওয়াবো?’
শুধু বাঁকখালী নদীর মাঝিরঘাট নয়, এ নদীর উপকূলে থাকা ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্পের অবস্থা প্রায় অভিন্ন। এসব পাম্পের জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার। তবে কিছু পাম্প সাত দিন, আবার কিছু পাম্প তিন দিন ধরে বন্ধ।
চেয়ারম্যানঘাট এলাকায় নোঙর করা ‘এফবি শাহ মজিদিয়া’ ট্রলারের মাঝি আব্দুস শুক্কুর বলেন, ‘তেলের আশায় দুই দিন ধরে ঘাটে অপেক্ষা করছি। আমাদের ট্রলারের জন্য প্রায় দুই হাজার লিটার তেল প্রয়োজন, তবে তেল না পাওয়ায় সাগরে যেতে পারছি না।’
জেলে মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘ঘাটে প্রায় ৫০০ জেলে বেকার বসে আছি। এই ৫০০ জেলের আয়ের ওপর অন্তত ৫ হাজার মানুষের সংসার চলে। ডিজেল সংকটের কারণে পাঁচ দিন ধরে ট্রলারে বসে আছি, সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার মালিকরাও কোনো টাকা দিতে পারছেন না। তারা বলছেন, সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে না পারলে টাকা দেবেন কীভাবে।’
চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং পাম্পের ব্যবস্থাপক রিয়াজ উদ্দিন সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘প্রায় সাত থেকে আট দিন ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। তবে তেল সরবরাহ একেবারেই কম। এ কারণে মাছ ধরার ট্রলারে আমরা তেল দিতে পারছি না।’
কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতি লিমিটেডের মুখপাত্র মো. আজাদুর রহমান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন উপকূলের জেলেরা। দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে প্রায় এক থেকে দুই লাখ জেলে পরিবার দুর্ভোগে পড়বে।’