আলোচনার নামে যুক্তরাষ্ট্রের সময় ক্ষেপণ! নতুন নীলনকশা মার্কিন সেনাদের! প্যারাসুটে ইরানে নামবে ২০ হাজার সেনা।

যুক্তরাষ্ট্রের এলিট র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন নামানোর পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে ইরানে বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে মার্কিন বাহিনী। পেন্টাগন এটাকে বলছে ফাইনাল ব্লো (চূড়ান্ত আঘাত)। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
এয়ারবোর্ন ডিভিশনকে মার্কিন বাহিনীর অত্যন্ত পাওয়ারফুল ইউনিট ধরা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এদেরকে যেকোনো জায়গায় নামানো যায়। জরুরি সামরিক অপারেশনের জন্য তাদেরকে ব্যবহার করা হয়। এরা প্যারাসুট দিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে পারে। শত্রু এলাকার ভেতরে ঢুকে এয়ারফিল্ড, দ্বীপ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দ্রুত দখলে নিতে পারে।
এবারে ইরানের যুদ্ধটা হতে পারে কয়েকটা জায়গা ঘিরে
১. খার্গ আইল্যান্ড
২. কেশম দ্বীপ
৩. হরমুজ প্রণালী
৪. লারাক আইল্যান্ড
৫. বন্দর আব্বাস
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, ৮২তম এয়ারবোর্নের ৩০০০ সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। ট্রাম্প এদেরকে দিয়ে ইরানের খার্গ আইল্যান্ড দখল করাতে চায়।
ইকোনোমিক টাইমসের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, ৪৫০০ মার্কিন মেরিন সেনা অলরেডি মধ্যপ্রাচ্যে আছে। এই সপ্তাহে ৩১তম এক্সপেডিশনারি ইউনিটের আরও ২৩০০ সৈন্য সেখানে পৌঁছাবে। এছাড়া ১১তম ইউনিটও এপ্রিলের মাঝামাঝি তাদের সাথে যোগ দিবে। ইউএসএস টিপ্রলি ও অরলিন্স মিলিয়ে এক্সট্রা ৭০০০ সৈন্য যুক্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মোট সৈন্যসংখ্যা আনুমানিক ৫০ হাজার বলে মনে করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ধাপে ব্যাপক বোম্বিং করবে। ইরানের রাডার, এয়ার ডিফেন্স ও মিসাইল সিস্টেম ধ্বংস করবে। তারপর প্যারাশুট দিয়ে এয়ারবোর্ন ডিভিশন নামবে। দ্রুত এয়ারফিল্ড, বন্দর ও দ্বীপের কন্ট্রোল পয়েন্ট দখল করবে। পরবর্তীতে তাদের সহায়তা করতে আসবে মেরিন ও স্থল সেনা। যুদ্ধ মোটামুটি গ্রাউন্ড ইনভ্যাশনে রূপ নিবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চূড়ান্ত যুদ্ধের টার্গেট হবে খার্গ আইল্যান্ড, কেশম দ্বীপ, হরমুজ প্রণালী, লারাক আইল্যান্ড ও বন্দর আব্বাস ঘিরে। খার্গ হচ্ছে ইরানের তেলের লাইফলাইন। দেশটির ৯০% তেল এখান দিয়ে যায় (বিস্তারিত কমেন্টে)।
কেশম দ্বীপকে বলা হয় ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নগরী, নৌ ড্রোন ও মাইন লুকানো আছে এখানে। আর হরমুজ তো ইরানের ট্রাম্পকার্ড। এটা দিয়ে বিশ্বের তেল চলাচল বন্ধ করে দিতে পেরেছে। হরমুজের পাশে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার লারাক আইল্যান্ড, ইরানি নৌবাহিনীর কৌশলগত ঘাঁটি।
অন্যদিকে বন্দর আব্বাসকে বলা যায় ইরানের সামরিক কন্ট্রোল সেন্টার। নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি হওয়ায় এখান থেকে তারা যুদ্ধজাহাজ, মিসাইল বোট, ড্রোন অপারেশন চালানো হয়। এই সেন্টার থেকে তারা হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, প্রয়োজনে মার্কিন জাহাজে হামলা চালাতে পারে।
কিছু রিপোর্টে বলা হচ্ছে, এগুলোর বাইরে ইসপাহানের স্থাপনাও দখল নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যেখানে ইরানের ৪৫৪ কেজি ইউরোনিয়াম মজুদ আছে বলে মনে করা হয়।
এখন ইরানের প্রস্তুতি কী?
ইরানের সেনা কমান্ডার জেনারেল আলী জাহানশাহী গতকাল বলেছেন, গ্রাউন্ড ওয়ার হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সেটা হবে আরও ভয়ংকর, আরও ব্যয়বহুল।
দ্য নিউ আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আক্রমণ ঠেকাতে ইরান ১০ লাখের বেশি যোদ্ধা প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে নিয়মিত সেনাবাহিনী তো আছেই, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি), রিজার্ভ ফোর্স এবং স্বেচ্ছাসেবক বাজিস ফোর্সও থাকছে।
রিপোর্টে বলা হচ্ছে, দেশপ্রেমে ঐক্যবদ্ধ ইরানিদের মধ্যে ‘উচ্ছ্বাসের ঢেউ’ জেগেছে। তারা মার্কিন বাহিনীর জন্য ‘ঐতিহাসিক নরক’ তৈরি করবে। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে ইরানের তরুণরা বেশি করে নাম লেখাচ্ছে। এদের বেশিরভাগ আগেই সামরিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত। নতুনভাবেও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ইরান কয়েক দশক ধরে এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েছে। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের খুঁটিনাটি স্টাডি করেছে বিপ্লবী আইআরজিসি। তারা চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে প্রশিক্ষণও পেয়েছে। এর মধ্যে চীন সম্ভবত উন্নতমানের জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েছে ইরানকে। সেটা সত্যি হলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর কপালে শনি আছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খার্গ দ্বীপের আশেপাশে কৌশলগত জায়গাগুলোতে অ্যান্টি-পার্সোনেল ও অ্যান্টি-আর্মার মাইন পুঁতে রেখেছে ইরান। মার্কিন সেনারা এসব দ্বীপে অবতরণ করলে ফাঁদে পড়ে যাবে। অতিরিক্ত রসদ ছাড়া বেশিদিন টিকতেও পারবে না। রসদ আনার মতো বিমানঘাঁটি বা রাস্তাঘাট আগেই বোম্বিং করে ধ্বংস করে ফেলেছে ইসরাইল ও আমেরিকা।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী বাহিনী দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ যোদ্ধা। শহরের গলি থেকে পাহাড়ের দুর্গম উপত্যাকায় তারা লড়তে অভ্যস্ত। তারা দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর পক্ষে ও সিরিয়ায় আসাদের পক্ষে আরব-মার্কিন মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্ত।
এদিকে ইরানের জনগণ এখন আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। তাদের তরুণরা ধর্মীয়ভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধে প্রস্তুত। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধে জড়িয়ে পড়বে ইরান। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়াবে। আর তেল সরবরাহ বন্ধ হলে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া হবে।
উপসাগরীয় দেশগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা চাচ্ছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মাটিতে ঢুকে পড়ুক। পাকিস্তান-তুরস্ক চেষ্টা করলেও আরব রাষ্ট্রগুলো শান্তি প্রস্তাবে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।
দেখা যাক, ফলাফল শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায়!
লেখক:
শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পটুয়াখালী সরকারি কলেজ।




আপনার মন্তব্য লিখুন