তেল নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা

জ্বালানি তেল নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছে সরকার। তেলের অবৈধ মজুত রোধ করতে সারা দেশে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সব পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি তেলের পরিবহন কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের সব পাম্পে একজন করে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তেলের ডিপোগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত রোধে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো শুরু করেছে সরকার।

- বিজ্ঞাপন -

ট্যাগ অফিসার নিয়োগ : ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের পরিবহন বা সরবরাহ কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য দেশের প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে একজন করে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ফুয়েল স্টেশনের তদারকির জন্য একজন করে সরকারি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। ডিপো থেকে ঠিক কী পরিমাণ জ্বালানি উত্তোলন করা হচ্ছে এবং উত্তোলিত সেই তেল শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ফিলিং স্টেশনে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটি তদারকি করবেন তারা। সরকারের পক্ষ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, জ্বালানি তেল ফিলিং স্টেশনে না গিয়ে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এই ট্যাগ অফিসারদের নিয়োগ দেবে। মহানগরীর বাইরের জেলা ও বিভাগীয় শহরের পেট্রোল পাম্পগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকরা ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করবেন। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে এই নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। মাঠপর্যায়ে তদারকি জোরদার করা, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও বণ্টন নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন : অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেলের মজুত রোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশের ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করেছে সরকার। গতকাল বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলামের সই করা এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে অননুমোদিতভাবে জ্বালানি তেল মজুতের অপচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এসব অপচেষ্টা প্রতিরোধ, জ্বালানি তেল বিপণনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে মোতায়েন কার্যক্রম সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ইউনিট সদর থেকে দূরবর্তী এলাকায় দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে নিরাপদ স্থানে অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২৫ মার্চ সকাল থেকে ঢাকা জেলায় একটি, কুড়িগ্রামে দুটি, রংপুরে তিনটি, রাজশাহীতে তিনটি, সিলেটে দুটি, মৌলভীবাজারে তিনটি, কুমিল্লায় তিনটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি এবং সুনামগঞ্জে একটি ডিপোসহ মোট ৯টি জেলার ১৯টি ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় বার্তায়। মোতায়েনকৃত সদস্যরা অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্পে একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত তদারকি, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করছেন। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, অবৈধ জ্বালানি মজুত ও বিক্রয় প্রতিরোধ এবং নাশকতা ঠেকাতে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বাধীন ডিপো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় বিজিবির দৃশ্যমান উপস্থিতির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং জনমনে আস্থা বৃদ্ধিতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়। এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার প্রতিরোধে অতিরিক্ত টহল, নৌ টহল জোরদার, চেকপোস্ট স্থাপন করে তল্লাশি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইসিপি ও এলসিপিগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিতে ব্যবহৃত ট্রাক-লরিসহ বিভিন্ন যানবাহনে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।

অবৈধ মজুত রোধে প্রচার : এরই মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় তেলের অবৈধ মজুত রোধে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। এ সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে। ভোক্তাদের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল ক্রয় না করার জন্য বলা হয়েছে। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। এ ধরনের জ্বালানি তেল মজুত করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাই, অবৈধ জ্বালানি তেল মজুত না করার জন্য বলা হয়েছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রতিটি জেলায় বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট সক্রিয় আছে। সরকার এখন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। তাই অতিরিক্ত লাভের আশায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত না করার জন্য বলা হয়েছে। সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল ক্রয় করছে। তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

জামালপুরে ১২টি ড্রামে ২৫০০ লিটার অবৈধ মজুত : তেল নিয়ে প্রতিদিনই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গতকাল জামালপুর জেলার সদর উপজেলার পিটিআই মোড়ে অবস্থিত মেসার্স জুই এন্টারপ্রাইজে অভিযান পরিচালিত হয়। জুই এন্টারপ্রাইজ থেকে চালকদের জানানো হয় তাদের কাছে কোনো পেট্রোল নেই। তাদের এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশে জেলা প্রশাসনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বিএমএসআর আলিফ ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব মো. সোহেল মাহমুদ ঘটনাস্থলে যান। জুই এন্টারপ্রাইজ সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ১২টি ড্রামে প্রায় ২৫০০ লিটার পেট্রোলের তেলের মজুত পাওয়া যায়। মজুত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকের নিকট তেল বিক্রি না করার অপরাধে জুই এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজারকে ভোক্তা অধিকার সংক্ষণ আইন, ২০০৯ এর অধীন ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্রাহকদের মাঝে তেল বিতরণ শুরু হয়। এ ছাড়া ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার একটি পেট্রোল পাম্পে অবৈধভাবে মজুত করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ করেছেন প্রশাসন। এ ঘটনায় পাম্প মালিককে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল উপজেলার পয়ারী রোড আমুয়াকান্দায় ‘মেসার্স পপি ট্রেডার্স’ নামে পেট্রোল পাম্পে (মিনি পাম্প) এ অভিযান পরিচালনা করা হয় বলে জানান ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া ইসলাম সীমা। তিনি বলেন, অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করার গোপন খবর পেয়ে দুপুরে পেট্রোল পাম্পটিতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় পাম্পটিতে তেল সংরক্ষণ করা বিভিন্ন হাউস তল্লাশি করে ৪ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল এবং ১৯ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল পাওয়া যায়।

- বিজ্ঞাপন -

ডিপো থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের সময়সূচিতে পরিবর্তন : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিভিন্ন কোম্পানির ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পেট্রোলপাম্পে সরবরাহের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ২ ঘণ্টা এগিয়ে সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত করা হয়েছে। বিপিসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় জ্বালনি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী বিপণন কোম্পানিসমূহের মাধ্যমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে দেশব্যাপী ফিলিং স্টেশন, প্যান্ড পয়েন্ট ডিলার ও পাম্পসমূহে জ্বালানি পণ্য সঠিকভাবে সরবরাহ কার্যক্রম নিশ্চিতে বিপিসির অধীন কোম্পানিসমূহের প্রধান স্থাপনা/ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহের জন্য নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, প্রধান স্থাপনা/ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৭টায় আর কার্যক্রম শেষ হবে বেলা ৩টায়।

আপনার মন্তব্য লিখুন

- Google -

আরও পড়ুন

Back to top button