কীর্তনখোলায় ফুল ভাসিয়ে ববি চাকমা সম্প্রদায় শিক্ষার্থীদের বিজু উৎযাপন

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা কীর্তনখোলা নদীতে ফুল ভাসিয়ে বিজু উৎসব উৎযাপন করেছে। রোববার (১২ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটস্থ কীর্তনখোলা নদীর তীরে তারা এই উৎসব উৎযাপন করেন। উৎসবে তারা পাহাড়ে মঙ্গল ও শান্তি কামনা করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব ‘বিজু’র রঙে সেজেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। বাংলা নববর্ষকে বরণ এবং পুরনো বছরকে বিদায় জানাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা বর্ণিল আয়োজনে পালন করেছে ‘ফুল বিজু’। রোববার সকাল থেকেই চাকমা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে নদীর তীরে সমবেত হন। তারা বন থেকে সংগ্রহ করা নানা রঙের ফুল দিয়ে সাজান নদীর ঘাট। এরপর দেশ ও পাহাড়ের মঙ্গল কামনায় এবং পুরনো বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলার প্রার্থনা করে কীর্তনখোলা নদীর শান্ত জলে ফুল ভাসিয়ে দেন। এ বিষয়ে লোক প্রশাসন বিভাগের (২০২১–২০২২) সেশনের শিক্ষার্থী রফিন চাকমা বলেন, “বিজু আমাদের চাকমা সম্প্রদায় তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীদের প্রধান সাংস্কৃতিক উৎসব। বাংলা বছরের শেষ দুই দিন এবং পহেলা বৈশাখ—মোট ৩ দিন আমরা এই উৎসব পালন করে থাকি। এই তিন দিনকে আমরা যথাক্রমে ‘ফুল বিজু’, ‘মুর বিজু’ এবং ‘গোজ্জে পোজ্জে’ হিসেবে পালন করি। এছাড়া অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরা তাদের নির্দিষ্ট নামে পালন করে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা আজকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা মিলে ফুল বিজু পালন করেছি। আজকের দিনটিতে মূলত আমাদের গঙ্গা মা (গাংমাতা)-এর উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল দিয়ে থাকি। যেখানে আমরা নিজের, পরিবারের তথা সকলের সুখ, শান্তি এবং মঙ্গলকামনায় পুরাতন বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। এরপরের দিনটি হচ্ছে ‘মুর বিজু’। এই দিনে আমরা নানারকম ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করি, যার প্রধান আকর্ষণ ‘পাজন’, যেটা কয়েক প্রকার সবজি দিয়ে রান্না করা হয়। এই দিনে আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলিত হই। বিজু শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লালন এবং রক্ষা করার একটি বিশেষ দিন। তবে ঐতিহ্য রক্ষা করা শুধু একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাষ্ট্রেরও একটি দায়িত্বের বিষয়। তাই আমি বিশ্বাস করি রাষ্ট্র আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহযোগী হবে।” ইতিহাস বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী স্নেহা চাকমা বলেন, “বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুক উৎসব শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং এটি পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের বন্ধনকে দৃঢ় করে। প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে আয়োজন করা হয় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শোভাযাত্রা, পালাগান, পাজন ও পিঠা উৎসব এবং এছাড়াও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রদর্শনী করা হয়ে থাকে।” উল্লেখ্য, জানা যায় চাকমা জনগোষ্ঠী আগামী ৩ দিন পর্যন্ত বিজু উৎসব উদযাপন করবেন। শিক্ষার্থীদের একজন বলেন: “আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করি। যদিও আমরা পাহাড় থেকে দূরে সমতলে পড়াশোনা করছি, তবুও এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা আমাদের শিকড়কে অনুভব করি এবং সবার মাঝে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই।” উৎসবটি কেবল একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সকলের মাঝে এক অনন্য ভ্রাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য, প্রতিবছরই চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষ উপলক্ষে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা বিজু, বৈসু ও সাংগ্রাই উৎসবের আয়োজন করে থাকে। কীর্তনখোলার জলে ভাসিয়ে দেওয়া সেই ফুলগুলো যেন নতুন বছরের নতুন সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে বয়ে চলেছে।



আপনার মন্তব্য লিখুন