আজ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল

অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতির সন্ধ্যা ৬টায় ঘোষণা করা হচ্ছে এ নির্বাচনের তফসিল। বুধবার বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সিইসির সাক্ষাৎ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের ভাষণ রেকর্ড করা হয়। বিটিভি ও রেডিওতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন সিইসি। ভোট হবে ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ইসি কর্মকর্তারা বহু আগে থেকেই বলে আসছিলেন ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তায় জাতীয় সংসদ ও গণভোটের তফসিল এবং ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তায় একই দিনে ভোট হবে। তফসিলের পর ভোটের জন্য কম-বেশি ৬০ দিন সময় রাখার কথাও ইসির পক্ষ থেকে জানানো হয়। সে হিসাবে ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা ও ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়। তার পরও বিভিন্ন মহল এই সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে কি না সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করতে থাকে। সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর ওইসব মহল নির্বাচন নিয়ে আরও জোরেশোরে সংশয় প্রকাশ করে।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সিইসিকে জানায়, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে বিএনপির নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কোনো সমস্যা হবে না। যথাসময়ে তফসিল ও নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতা করবে। তাই নির্বাচন কমিশন যেন নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো মহলের সংশয়কে আমলে না নেয়। কারণ গণতন্ত্রের স্বার্থে যথাসময়ে নির্বাচন হওয়া জরুরি। দেশের মানুষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।
যথাসময়ে নির্বাচনের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চান। সিইসি নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করার পর তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে রোডম্যাপ অনুসারে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ও ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করতে বলেন। সেইসঙ্গে তিনি বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা নির্বাচনের জন্য সরকার সার্বিক সহায়তা প্রদান করবে।
সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের পুরো নির্বাচন কমিশন বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দেড় ঘণ্টাব্যাপী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেলা ২টার পর তারা বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে সরাসরি আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে ফিরে যান। বিকেল থেকে সেখানে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে সিইসির ভাষণ রেকর্ড করা হয়।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন চার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ও নির্বাচন কমিশন সচিব হিসেবে আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সাক্ষাতের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হবে। সন্ধ্যা ৬টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এবং তফসিল ঘোষণা করবেন। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। ব্যালটের রং, ভোট গণনা পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছেন সিইসি। নির্বাচন কমিশনের সার্বিক প্রস্তুতিতে রাষ্ট্রপতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ইসি সচিব বলেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং অন্য বিষয়গুলো অবহিত করার জন্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে বিষয়গুলোর আপডেট জানিয়েছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে ভোটার তালিকা। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এ দুটি একই দিনে কিভাবে আমরা করব, ব্যালট পেপারগুলো কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে, এগুলোর রং কী হবে, ব্যালট পেপার কীভাবে একজন ভোটারকে দেওয়া হবে, ভোট গণনার পদ্ধতি কী হবে, এগুলো বিস্তারিত তিনি জানতে চেয়েছেন। আমরা আমাদের দিক থেকে তাকে বিস্তারিত জানানোর পর তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অর্থবহ করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
ইসি সচিব বলেন, জাতীয় সংসদ ও গণভোট একই দিনে একসঙ্গে হচ্ছে বিধায় আমরা যে ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়েছি (সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত) এ সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হয়েছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে যেটা জেনেছেন সেটা হচ্ছে ‘আউট অফ কান্ট্রি ভোটিং’ এবং ‘ইন কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’। এ সম্পর্কে পদ্ধতিগত বিন্যাস ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো শুনে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তিনি সার্বিকভাবে আমাদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে একটি ভালো, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য যতটুকু সাহায্য-সহযোগিতা এবং সহানুভূতি তার দিক থেকে দেওয়ার সুযোগ আছে, তিনি তারচেয়ে বেশি ছাড়া কম দেবেন না।
এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, বাগেরহাটের চারটি আসন পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি। তবে এখনো কোনো কোর্ট অর্ডার পাইনি। তাই আদালতের আদেশ হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করাটা সমীচীন নয়। তবে বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনভিত্তিক তফসিলই ঘোষণা করা হচ্ছে। আদালতের রায় হাতে পাওয়ার পর যদি প্রয়োজন হয়, সে অনুযায়ী সংশোধন করা যাবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচনের প্রস্তুতির সার্বিক বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করা হবে। ৮ বা ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুসারে দেশে এখন ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। চূড়ান্ত তালিকায় পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন ও নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন। এ বছর ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ হয়েছে তাদের নিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা করা হয়েছে। তারা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পারবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে ইসি। প্রায় ১০ লাখ নির্বাচন কর্মকর্তার তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা যায়।
এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটার হিসেবে অংশ নিতে প্রবাসী, কারাবন্দি ও নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থানরত সরকারি চাকরিজীবীরা নির্বাচন তফসিল ঘোষণার দিন থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধন করা ভোটারদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যালট পেপার চলে যাবে তাদের ঠিকানায়। ভোটদানের পর আবার নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যেই তাদের ব্যালট পেপার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
দেশের ইতিহাসে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে এবারই প্রথম হতে যাচ্ছে গণভোট। আর এ কারণেই এবারের নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করছে ইসি। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতিও সেভাবেই নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক ভোটারের জন্য থাকছে ২টি করে ব্যালট পেপার। সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য রঙিন ব্যালট পেপার দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, দেশে এর আগে ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এর ৬০ দিন আগে ৭ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ভোট হয় পরের বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি (পুনঃতফসিল)। ১৯৮৬ সালের ২ মার্চ ঘোষণা করা হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। ৪৭ দিন পর ভোট হয় ৭ মে। ১৯৮৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় । ভোট হয় ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ।
পঞ্চম জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১৯৯০ সালের ১৫ ডিসেম্বর। ৭৮ দিন পরে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ভোট। ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। ৫৫ দিন পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি (পুনঃতফসিল) ভোট হয়। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১৯৯৬ সালের ২৭ এপ্রিল। ৪৭ দিন পর ওই বছরের ১২ জুন ভোট অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০০১ সালের ১৯ অগাস্ট। ৪২ দিন পর ১ অক্টোবর ভোট হয়।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর। ভোট হয় ৪৭ দিন পর ওই বছর ২৯ ডিসেম্বর (পুনঃতফসিল)। ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এর ৪২ দিন পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ভোট। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর। ৪৬ দিন পর ৩০ ডিসেম্বর (পুনঃতফসিল) অনুষ্ঠিত হয় ভোট। আর সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর। আর ভোট গ্রহণ করা হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি।




আপনার মন্তব্য লিখুন